বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
পুকাশ স্কুল এন্ড কলেজের ইতিবৃত্ত: একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন
অত্র অঞ্চলে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময়ে স্কুল স্থাপনের জন্য সভা-সমাবেশ হলেও নানা কারণে তা সফল হচ্ছিল না। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে আসেন ৫ নং আলীরগাঁও ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান জনাব গোলাম কিবরিয়া হেলাল।
প্রথম প্রচেষ্টা: স্বাধীন বাংলা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ
চেয়ারম্যান মহোদয় ১ নং এবং ২ নং ওয়ার্ডের ১১টি গ্রামের (১১ মৌজা) মুরব্বিয়ান, শিক্ষিত সমাজ ও যুবসমাজকে একত্রিত করেন। সকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে কয়েক বছর আগে “স্বাধীন বাংলা পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ” নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। হাতিরপাড়া টু মানিকগঞ্জ রাস্তার পশ্চিম পাশে এক একর জমি নির্বাচন করা হয়। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, জমির মালিকরা স্বেচ্ছায় জমি দান না করলে উপযুক্ত মূল্যে জমি কেনা হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিটি গ্রাম থেকে ১০ হাজার টাকা করে মোট ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকার একটি তহবিলও গঠন করা হয়েছিল।
দুঃখজনকভাবে, কিছু জমির মালিক জমি দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় এই দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং সংগৃহীত অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় প্রচেষ্টা: পুকাশ স্কুল এন্ড কলেজের জন্ম
অত্র এলাকার জন্য একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য হওয়ায় স্কুল স্থাপনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। ২০১৬ সালে, ৫ নং আলীরগাঁও ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের ৬ মৌজা মিলে পুনরায় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এই ৬ মৌজার একটি দৃঢ় সামাজিক বন্ধন রয়েছে, যা একটি মাদরাসা ও একটি ঈদগাহ (মিফতাহুল কোরআন আব্দুল মহল মাদরাসা এবং আব্দুল মহল শাহী ঈদগাহ) পরিচালনার মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়েছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মহল মৌজায় অবস্থিত এবং উভয়ই ৬ মৌজা দ্বারা পরিচালিত হয়। চেয়ারম্যান হেলাল সাহেব ৬ মৌজার মুরব্বিয়ানদের সাথে কয়েক দফা আলোচনা শেষে একটি সুদৃঢ় ঐকমত্যে পৌঁছান।
স্থান নির্বাচন ও নামকরণ
আলোচনার ফলস্বরূপ পুকাশ মৌজায় স্কুল স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। পুকাশ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই চূড়ান্তভাবে স্থান নির্বাচন করা হয় এবং “পুকাশ স্কুল এন্ড কলেজ” নামকরণ করা হয়। লক্ষ্য স্থির করা হয়, পর্যায়ক্রমে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণীতে উন্নীত করা হবে। কিছু জমির মালিক জমি দান করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং কিছু জমি ক্রয় করা হয়। সব মিলিয়ে এক একরের বেশি জায়গার ব্যবস্থা হয়।
অর্থায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ
পূর্বে উল্লিখিত ৬ মৌজার কিছু সম্মিলিত সম্পদ ছিল। এর মধ্যে একটি রেকর্ডিও জলমহল ১০ বছরের জন্য ১৮,৫০,০০০/- (আঠারো লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকায় বিক্রি করা হয়। চেয়ারম্যান সাহেবের উদ্যোগে এবং ৬ মৌজাবাসীর সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টায় একটি দৃষ্টিনন্দন স্কুল ভবন প্রতিষ্ঠা করা হয়। চেয়ারম্যান জনাব গোলাম কিবরিয়া হেলাল সাহেবকে সভাপতি করে প্রত্যেক মৌজা থেকে প্রতিনিধি নিয়ে স্কুল বাস্তবায়ন ও পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। এলাকার কিছু ব্যক্তির অনুদান এবং ইউনিয়ন পরিষদের অনুদানে একটি সুন্দর একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়।
শিক্ষাদান কার্যক্রম শুরু
গোয়াইনঘাট সরকারী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক বাবু গোপাল কৃষ্ণ দে-কে তত্ত্বাবধায়ক এবং মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আল্লাহ তায়ালার নামে স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নিম্ন মাধ্যমিক থেকে শুরু করতে হয় এবং প্রথমে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠদানের অনুমতি নিতে হয়। ঢাকা ও সিলেটে কয়েকবার দৌড়াদৌড়ির পর সিলেট শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক কয়েক দফা পরিদর্শনের শেষে পাঠদানের অনুমতি প্রাপ্ত হওয়া যায়। (এখানে উল্লেখ্য, বাবু গোপাল কৃষ্ণ দে অবৈতনিক হিসাবে প্রতিষ্ঠানের অনেক সাহায্য করেছেন)। স্থানীয় শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পাঠদান শুরু হয়।
পাশের প্রাইমারি স্কুলটি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হওয়ায় অনেক সময় পঞ্চম শ্রেণি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে প্রায় ছাত্রছাত্রীরা সেখানেই থেকে যেতে চায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রতিটি উপজেলায় একটি করে প্রাইমারি স্কুল পাইলট প্রকল্প হিসেবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত খোলা হয়েছিল, কিন্তু এই প্রকল্প আর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ইতোমধ্যে পুকাশ স্কুল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং নবম শ্রেণির পাঠদানের অনুমতিও পেয়েছে। ২০২৫ সালে এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথম এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সহযোগিতা কামনা
এলাকাটি আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ায় শিক্ষকদের যৎসামান্য বেতন ভাতা দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে ভালো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এলাকার শিক্ষা বিস্তারের জন্য স্কুলটির এমপিওভুক্ত হওয়া একান্ত জরুরি।
আমরা এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করি।
আল্লাহ হাফেজ।